নিজস্ব প্রতিবেদক, সুনামগঞ্জ: অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও দলগত প্রচেষ্টার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সুনামগঞ্জের তিন মেধাবী শিক্ষার্থী। বাংলাদেশের বৃহত্তম ভাষাবিষয়ক অলিম্পিয়াড হিসেবে পরিচিত বেকম্যান’স ৪র্থ আন্তর্জাতিক ল্যাঙ্গুয়েজ লিগের চূড়ান্ত পর্বে বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সেরা হয়ে তারা অর্জন করেছে স্বর্ণপদক ও সনদ।
চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্যরা হলো সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আব্দুর রাকিব ও ইবতেহাজুল হক জারীফ এবং এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমুস সালেহীন ফাইয়াজ।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) ইংরেজি ও আধুনিক ভাষা বিভাগের আয়োজনে গত ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন ১০ অক্টোবর আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে চ্যাম্পিয়ন দলকে স্বর্ণপদক ও সনদ প্রদান করা হয়।
তবে এই সাফল্য কেবল একটি প্রতিযোগিতায় জয়লাভের গল্প নয়; এর পেছনে রয়েছে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে লক্ষ্যে অবিচল থাকা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি।
হাত ভাঙার পরও দমেনি রাকিবের মনোবল
প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির সময় শ্রেণিকক্ষে পড়ে গিয়ে ডান হাত ভেঙে যায় আব্দুর রাকিবের। এ কারণে প্রায় দেড় মাস তাকে বিছানায় বিশ্রামে থাকতে হয়। শারীরিক এই অসুস্থতা তার পড়াশোনা ও প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ালেও সে হাল ছাড়েনি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখেছে।
রাকিবের এই দৃঢ় মনোবল প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায় থাকলে লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
দূরে থেকেও প্রস্তুতিতে সক্রিয় জারীফ
প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিকালে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সিলেটে অবস্থান করছিল ইবতেহাজুল হক জারীফ। তবে ব্যস্ততার মধ্যেও দলের প্রস্তুতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি সে। অনলাইনে সতীর্থদের সঙ্গে যুক্ত থেকে পড়াশোনা, আলোচনা ও বিতর্কের প্রস্তুতি চালিয়ে গেছে।
শারীরিকভাবে দূরে থাকলেও দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে চূড়ান্ত পর্বের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে জারীফ। তার এই নিষ্ঠা ও লক্ষ্য অর্জনের দৃঢ় প্রত্যয় দলের সাফল্যে বিশেষ অবদান রেখেছে।
দলীয় সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ফাইয়াজের
চ্যাম্পিয়ন দলের আরেক সদস্য নাজমুস সালেহীন ফাইয়াজও প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করা থেকে শুরু করে সতীর্থদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখা—সব ক্ষেত্রেই তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
রাকিব ও জারীফ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হলেও ফাইয়াজ পড়াশোনা করে এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করায় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য একই ধরনের আনুষ্ঠানিক পোশাকের ব্যবস্থা করাও তার সামনে একটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দলের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে তার প্রচেষ্টা ছিল প্রশংসনীয়।
দলের প্রতি দায়বদ্ধতা, সহযোগিতার মানসিকতা ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে ফাইয়াজ।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সাফল্যের মুকুট
একজনের হাত ভেঙে যাওয়া, অন্যজনের দূরে অবস্থান কিংবা ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা—কোনো কিছুই এই তিন শিক্ষার্থীর অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি। নিয়মিত যোগাযোগ, সমন্বিত প্রস্তুতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আত্মবিশ্বাসের সমন্বয়ে তারা ছিনিয়ে এনেছে জাতীয় পর্যায়ের এই গৌরবময় সাফল্য।
তাদের এই অর্জনে গর্বিত পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ। তিন শিক্ষার্থীর সাফল্য জেলার শিক্ষাঙ্গনে আনন্দ ও গৌরবের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
তাদের এই স্বর্ণপদক জয় ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনের পথে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে এ অর্জন প্রমাণ করে, প্রতিভার সঙ্গে পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও দলগত ঐক্য যুক্ত হলে সাফল্যের পথ আরও সুগম হয়।
সুনামগঞ্জের এই তিন মেধাবী শিক্ষার্থীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা। তাদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে যাক নতুন প্রজন্মের মেধা, সৃজনশীলতা ও প্রতিভা।


















